সাক্ষাৎকার

বাংলাদেশের নোবেলের গলা ভালো লেগেছেঃ অনুপম

সাংবাদিকের একগুচ্ছ প্রশ্নের মুখোমুখি অটোগ্রাফ খ্যাত অনুপম রায়। হাসিমুখে দিয়েছেন সকল প্রশ্নের উত্তর। পাঠকদের উদ্দেশ্যে তুলে ধরা হল আলাপচারিতার চৌম্বকাংশ।

প্রশ্ন: ২০১০-এর আগেও কিন্তু এই চাপ ছিল না। কারণ, তখন আইটি সেক্টরে চাকরি। মাস গেলে একমুঠো মাইনে। অনেক নিশ্চিন্ততা। সেসব ছেড়ে এই চাপের দুনিয়ায় এলেন!

উত্তর: আসলে চাপ নেওয়াটা হয়ে গেছে। ২০১০-এ ‘অটোগ্রাফ’-এর ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’-এর সাফল্যের পরেই আমি সিদ্ধান্ত নিই যে এই দুনিয়াকেই আপন করব। সারা জীবন গান নিয়েই থাকতে চেয়েছি। চাকরি করতে করতেও গান-বাজনা করতাম। হ্যাঁ, এভাবে সব ছেড়ে নয়। আসলে, প্রথম সাফল্যের পরে অতকিছু মাথায় আসেনি যে পরে এটাই চাপ হয়ে ফিরবে। তখনও যে জানতাম না জনপ্রিয়তা কাকে বলে। মানুষের ভালোবাসা কাকে বলে। আর একবার যখন কেউ এই স্বাদ পেয়ে যায় তখন আস্তে আস্তে সে সেদিকেই ঝোঁকে। ফলে, চাপ বাড়ে। টেনশন বাড়ে। আস্তে আস্তে এতেই অভ্যস্ত করে নিয়েছি নিজেকে। এর মধ্যেই গান লিখি। সুর দিই। তৈরি করার সময় মাথায় থাকে না, এটা হিট হবে তো! রিলিজের পরে মনে হয়, জনপ্রিয় হলে ভালোই লাগবে।

প্রশ্ন: তাহলে প্রথম সাফল্য এটাই বোঝাল, নিশ্চিন্ততার থেকে চাপের দুনিয়ার এই যশ-খ্যাতি-অর্থ-প্রতিপত্তি অনেক বেশি ভালো?

উত্তর: এখন চাকরি জীবনেও নিশ্চিন্ততা নেই। কেউ আর ত্রিশ বছরে চাকরিতে ঢুকে ষাট বছরে একই অফিস থেকে অবসর নেন না। যুগ অনেক ফার্স্ট এবং ভাস্ট। এক সংস্থায় এখন একজন দু-থেকে তিনবছরের বেশি থাকেন না। আমি টানা ছ-বছর চাকরি করেছি। খুবই ভালো ছিল আমার অফিস। কিন্তু বোর হয়ে গেছি ততদিনে। কবে ছাড়ব কবে ছাড়ব যখন করছি তখনই মুক্তি পেল সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের অটোগ্রাফ। আমি আর পেছনে ফিরে তাকাইনি।

প্রশ্ন: এরপরেই সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের ‘২২ শে শ্রাবণ’, ‘চতুষ্কোণ’ সহ একাধিক ছবিতে সুর, গান। সৃজিতদাকে প্রথমবার ইম্প্রেসড করতে অনেক গান শোনাতে হয়েছিল?

উত্তর: সৃজিতদা আমার পুরনো বন্ধু। ২০০৫ সাল থেকে গান শুনিয়ে বোর করে ফেলেছি সৃজিতদাকে। তাই উনিই আমার আগের গান থেকে বেছে রেখেছিলেন কী কী গান অটোগ্রাফ-এ যাবে। ইমপ্রেসড করতে হয়নি (হাসি)।

প্রশ্ন: তারপরে কৌশিক গাঙ্গুলি হয়ে এখন নন্দিতা রায়-শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়দের সঙ্গে কাজ করছেন। আপনার চোখে কলকাতার প্রথম সারির এই তিন পরিচালক কেমন? কাজের অভিজ্ঞতাই বা কেমন?

উত্তর: তিনজন পরিচালকই স্বতন্ত্র। তিনজনেরই নিজস্ব ঘরানা বা স্টাইল আছে। এঁদের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতাও খুবই ভালো। আশা, আগামী দিনেও এঁদের সঙ্গে আবার কাজের জন্য তো মুখিয়েই থাকব। আর কাজ নিয়ে আমি কী বলব! প্রত্যেকে নিজের নিজের ক্ষেত্রে মাস্টারপিস।

প্রশ্ন: এরই ফাঁকে বলিউডেও নিজের আসন পাকা করে ফেলেছেন। জার্নিটা কি খুবই পরিশ্রমের? না অনায়াসেই ঘটেছে সবটা?

উত্তর: সত্যি বলতে কি, কোনও স্ট্রাগল করতে হয়নি আমায়। অনায়াসেই হয়েছে সবটা। এর জন্য ভাগ্যকে ধন্যবাদ দেব। সুজিত সরকারের ‘পিকু’ আমার অনেকটা এগিয়ে দিয়েছে। ছবির গান, ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর আজও লোকে গুনগুন করে। এই মার্চে মুক্তি পাওয়া সুজয় ঘোষের ‘বদলা’ ছবিতে আমার গান আছে। বলতে পারেন, দু-নৌকোয় পা দিয়ে দিব্যি দিন কাটছে। তবে বাংলার নৌকোটাই বেশি ভারী। অনেক কাজ তো এখানে। বলিউড বছরে একবার কি দু-বার ডাকে।

প্রশ্ন: অনুপম রায় মানেই নতুন শিল্পীর জন্ম। সেটা ইমন চক্রবর্তী হতে পারেন। লগ্লজিতা হতে পারেন। কিংবা একদম নতুন বাংলাদেশের নোবেল। ইমন, লগ্নজিতাকে শ্রোতারা চিনে নিয়েছেন আপনার দৌলতে। আপনি নোবেলকে চিনতে সাহায্য করবেন?

উত্তর: নোবেলের গান শুনেছি সারেগামাপা-র মঞ্চে। ভালো লেগেছে গলা। তবে কোনও শিল্পীকে ভেবে তো আর গান বাঁধা যায় না। সিনেমার প্রয়োজনে গান তৈরি হয়। সেই বুঝে শিল্পী বাছা হয়। ‘ভিঞ্চিদা’ ছবির গান তৈরির সময় সৃজিতদার সঙ্গে যখন আলোচনা করছিলাম তখনই মনে হয় নোবেলের কথা। সৃজিতদাও রাজি হয়ে যান। আমার পুরনো একটা গানই গেয়েছে নোবেল। শ্রোতারা যখন শুনে ভালো বলেছে, তখন ওর মধ্যে নিশ্চয়ই প্রতিভা আছে।

প্রশ্ন: কেউ কেউ আগে সিচ্যুয়েশন বা গল্প জেনে সুর করেন। তারপর তাঁর সুরে কথা বসে। আপনিও কি এভাবেই সুর দেন? আপনার সুপারহিট গানের পিছনেও কি গল্প লুকিয়ে আছে?

উত্তর: সব গানের পেছনেই গল্প লুকিয়ে থাকে। আমারও আছে। এখন মোবাইলের দৌলতে অনেক সুবিধে হয়েছে। কোনও সুর মাথায় এলে রেকর্ড করে রাখি। আগে কলেজে পড়ার সময় হয়তো একটা সুর ভাঁজলাম। বাড়ি ফিরতে ফিরতে দেখি ভুলে গেছি বেমালুম। এখন আর সেটা হয় না। পরে যখন সেটা নিয়ে বসা হয়, তখন মাথায় যে টুকরো শব্দ বা ভাবনা আসে তাই দিয়ে তৈরি হয় গান। হ্যাঁ, অনেক সময় কিছু দৃশ্য দেখেও গান বা সুর আসে। কখনও কিছু ভাবনা, টুকরো কথা গানের জন্ম দেয়।

প্রশ্ন: শান্তনু মৈত্র সিনেমার গানের থেকে অরিজিনাস বেশি পছন্দ করেন। আপনিও কি তাই?

উত্তর: আমার তো পুরোটাই অরিজিনাল! (হাসি) তবে এটা ঠিক, সিনেমার গানের বাইরেও অন্য গান হওয়া খুবই জরুরি। তার জন্য চাই আলাদা প্ল্যাটফর্ম, মার্কেট। যা এখনও তৈরি হয়ে ওঠেনি ঠিকমতো। জানেন, আমরা শিল্পীরা একেক সময় একেক মুডে থাকি। তখন একেক রকমের গানের জন্ম হয়। কিন্তু সেই গানগুলো পড়েই থাকে। বেশির ভাগই সামনে আসে না। কারণ, সিনেমায় তো ঘুরেফিরে প্রায় একই সিচুয়েশন। হয় আনন্দের নয় দুঃখের। ওখানে এসবের জায়গা কই! এক যদি সিনেমার গান শুনতে শুনতে বোর হয়ে মানুষ এই গানের দিকে ঝোঁকে। তখন একটা কিছু হবে। আমিও ভ্যারাইটি ভীষণ পছন্দ করি।

প্রশ্ন: এই সীমাবদ্ধতার জন্যেই কি কিছু শ্রোতার অভিযোগ, অনুপম ঘুরেফিরে একই সুর দেন, একই রকমের গান লেখেন?

উত্তর: এখন কি আর কেউ বলেন? প্রথম প্রথম হয়ত অনেকের মনে হয়েছে। আর আমিও তো একই সঙ্গে এক ‘পুরনো মসজিদে’, ‘বসন্ত এসে গেছে’, ‘তুমি যাকে ভালোবাস’ বা ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও’—করেছি। সব কটাই কি এক? মনে হয় না। তবে এটা স্বীকার করব, আমার সুর বা কথায় আমার নিজস্ব স্টাইল আছে। সেটা বারে বারে হয়তো ফিরে আসে। যেটা অনেকেরই ভালো লাগে না। তার জন্য এই সমালোচনা। আমি মনে করি, এটা হওয়া দরকার। না হলে আমরা নিজেদের বদলাব, ভাঙব কী করে?

প্রশ্ন: এই মুহূর্তে দেশ খুব অসহিষ্ণু। খুব খারাপ সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি আমরা। অনুপম রায় এই নিয়ে কি কিছু করছেন?

উত্তর: এই ধরনের গানের জন্য আলাদা জায়গা দরকার। সিনেমাতে তো এই ধরনের গান চলবে না। আমি একটি গান করেছিলাম, ‘ইস্, দেবাশিস’ বলে। যেখানে একটি মানুষ নস্টালজিয়ায় থাকাকে ভেঙে দিতে চাইছে। এরকম গান এক-আধটা হয়ত হয়। স্লোগান ধর্মী গানের সুর কিন্তু খুব ভালো হয় না। ‘পথে এবার নামো সাথী’— ছাড়া। বাকিগুলো স্লোগান হয়েই থেকে যায়। তাই ঠিক করেছি, ঠিক মতো সুর দিতে পারলে, ঠিক জায়গা পেলে তবে এই ধরনের কাজে হাত দেব।

/আরএম

Related Articles

Leave a Reply

Close
Close